
নিজস্ব প্রতিবেদক | নারায়ণগঞ্জ সময় ২৪
নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। অভিযান চালানোর পর কিছুদিন ফুটপাত ফাঁকা থাকলেও আবারও ফিরে আসছেন হকাররা। সর্বশেষ রোববার রাতে হকার উচ্ছেদ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। এ সময় তাঁর গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন হকাররা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
হকারদের পুনর্বাসনের জন্য বিকল্প জায়গা প্রস্তুত করা হলেও সেখানে যেতে রাজি নন তাঁদের অনেকে। অন্যদিকে, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন সিটি প্রশাসক। এতে দীর্ঘদিনের হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সড়কসহ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাতের বড় একটি অংশ হকারদের দখলে থাকায় চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পথচারীদের। ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে অনেককে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে উচ্ছেদ অভিযান চললেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অভিযান শুরু হলে হকাররা আশপাশের গলিতে সরে যান। অভিযান শেষ হলে আবারও আগের জায়গায় বসেন। ফলে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগ বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা থাকাকালে চাষাঢ়ায় হকারদের জন্য পৌর হকার্স মার্কেট নির্মাণ করা হয়। সেখানে ছয় শতাধিক হকারকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনেকে দোকান বিক্রি করে আবার ফুটপাতে ব্যবসা শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি তৎকালীন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু সড়ক হকারমুক্ত রাখার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় মেয়র আইভী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এ ঘটনায় তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ উঠেছিল।
এরপর বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও ফুটপাত দখল নিয়ে বিরোধের স্থায়ী অবসান হয়নি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। দায়িত্ব গ্রহণের পর শহরের যানজট নিরসন ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেন তিনি। এ নিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেন।
পরবর্তী সময়ে হকার উচ্ছেদে যৌথ অভিযান চালানো হয়। কিন্তু কয়েক দিন পর আবারও বিভিন্ন স্থানে হকারদের ফিরে আসতে দেখা যায়।
এ পরিস্থিতিতে হকারদের পুনর্বাসনের জন্য শহরের মূল সড়কের পাশে রেললাইনের একটি খালি জায়গা নির্ধারণ করে সিটি করপোরেশন। সেখানে ইট বিছিয়ে বসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে হকারদের একটি অংশ ওই জায়গায় যেতে রাজি নন। তাঁদের দাবি, রেললাইনের পাশে নির্ধারিত স্থানটি স্থায়ী পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা দেয় না।
ফলে একদিকে বিকল্প জায়গা প্রস্তুত থাকলেও অন্যদিকে ফুটপাত দখলমুক্ত করা নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদকর্মীদের অভিযোগ, হকারদের একটি অংশ রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ায় অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয়। তাঁদের দাবি, কিছু রাজনৈতিক নেতা হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নিয়ে ফুটপাতে ব্যবসা চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
গত ৪ মে চাষাঢ়ায় উচ্ছেদ অভিযানের সময় সিটি করপোরেশনের দুই কর্মচারীকে মারধর এবং তাঁদের মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে হকারদের বিরুদ্ধে।
সর্বশেষ রোববার রাতে প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান হকার উচ্ছেদে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসকের নির্দেশে গ্রীনলেজ ব্যাংকের মোড়ে হকারদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে হকাররা তাঁদের মালামাল সড়কে ফেলে প্রতিবাদ জানান। এ সময় প্রশাসক ও উচ্ছেদকর্মীদের সঙ্গে তাঁদের তর্কাতর্কি হয়।
পরে পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে উঠলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় কয়েকজন হকারকে হেফাজতে নেওয়া হলেও পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার তদবিরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তী সময়ে হকার প্রতিনিধিরা থানায় গিয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন।
জাতীয়তাবাদী হকার্স ইউনিয়ন দলের মহানগর শাখার সভাপতি মিজানুর রহমান রনি বলেন, “আমরা চাই এর একটি স্থায়ী সমাধান। আমরা আজও থানায় গিয়েছিলাম। আমরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বসব। তারা আমাদের রেললাইনে জায়গা করে দিয়েছে। কিন্তু সেটা তো পার্মানেন্ট না। পার্মানেন্ট একটা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করা হলে হকাররা কোথাও যাবে না।”
হকারদের এই বক্তব্যে স্পষ্ট, বিকল্প জায়গা নির্ধারণ করা হলেও তার স্থায়িত্ব ও ব্যবসার উপযোগিতা নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে। ফলে পুনর্বাসনের উদ্যোগ কার্যকর করতে হকারদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি বলেন, “স্থায়ী সমাধানের জন্য হকারদের বসার ব্যবস্থা করেছি। তাদের রেললাইনে জায়গা করে দিয়েছি, কিন্তু যেতে না চাইলে তো কিছু করার নেই। পুরো শহরবাসীকে তো জিম্মি করা যাবে না। ওরা মানুষকে জিম্মি করে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে রাখে। গতকালও মব সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। এগুলো মেনে নেব না। ব্যবসা যদি করতে হয়, যেখানে জায়গা করেছি সেখানে বসবে। অন্যথায় ফুটপাত বা সড়কে বসা যাবে না।”
হকারদের পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয় থাকার অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু ব্যক্তি হকারদের সহযোগিতা করছেন। এ ছাড়া অন্য এলাকা থেকে এসে হকার সেজে ফুটপাত দখলের তথ্যও তাঁদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে আশাবাদ জানিয়ে সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, “ভালো কাজ করতে গেলে অনেক বাধাবিঘ্ন আসবেই। এসব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করেই কাজ করে যেতে হবে। আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ফুটপাত ফাঁকা রাখব।”
নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু অভিযান চালিয়ে হকার সরিয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হচ্ছে না। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তা হকারদের কাছে বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা জরুরি।
একই সঙ্গে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনার কারণে পথচারীদের চলাচলের অধিকার যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিকল্প স্থানে ব্যবসার সুযোগ, পুনর্বাসনের স্বচ্ছ নীতিমালা, নিয়মিত তদারকি এবং দখল পুনরায় শুরু হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রভাব বা অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকলে সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। অন্যদিকে, হকারদের জীবিকা ও পুনর্বাসনের বাস্তব সমস্যাগুলো বিবেচনায় না নিয়ে বারবার উচ্ছেদ চালানো হলে একই সংকট ফিরে আসার আশঙ্কা থাকবে।
তাই প্রশ্নটি শুধু হকার উচ্ছেদের নয়; বরং কীভাবে পথচারীদের অধিকার রক্ষা, যানজট নিরসন এবং হকারদের জন্য কার্যকর বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়। সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া নারায়ণগঞ্জের ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগ কতটা সফল হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।