

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা অবস্থান করা তার জুনিয়র বন্ধু হিসেবে পরিচিত দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকা থেকে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় দীপের বক্তব্যে বেশ কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে তার অবস্থান, চলাফেরা এবং তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় যাওয়ার কারণ নিয়ে একাধিক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ঘটনাস্থলে নিয়ে তথ্য যাচাই ও প্রাথমিক তদন্ত শেষে দীপকে নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পিবিআই।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিবাগত রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। পরে তাকে নিয়ে টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান ও তথ্য যাচাই করা হয়।
শুক্রবার পিবিআইয়ের তদন্ত দল দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যায়। তুরাগ নদসংলগ্ন ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পাশের মাঠে ঘটনার রাতে কী হয়েছিল, সে বিষয়ে তার কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়।
দীপের দেওয়া তথ্য অনুসরণ করে ওই এলাকা থেকে কালো রঙের একটি সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেলটির কোনো নম্বরপ্লেট পাওয়া যায়নি। এটি তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কি না, তা নিশ্চিত হতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মোটরসাইকেলটি তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে অবস্থানকালে কয়েকজন ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, ধাওয়াকারীদের মধ্যে দুজনের পরনে পুলিশের পোশাক ছিল।
তিনি জানান, ওই ব্যক্তিদের দেখে তাহসিফ দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং একপর্যায়ে নদীতে ঝাঁপ দেন। অন্যদিকে দীপ বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের আড়ালে আত্মগোপন করেন। পরে সেখান থেকে চলে যান বলে দাবি করেছেন তিনি।
তবে ধাওয়াকারীরা আসলেই পুলিশের সদস্য ছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। এ বিষয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান জানিয়েছেন, দীপের দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে। ওই এলাকায় পুলিশের কোনো দল দায়িত্ব পালন করছিল কি না, ইউনিফর্ম পরা ব্যক্তিদের উপস্থিতি ছিল কি না, সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পিবিআই কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে দীপ ঘটনার রাতের অবস্থান ও সেখানে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি ওই স্থানে যাওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেন। পরে মোটরসাইকেলটির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে জানান, তাহসিফ তাকে মোটরসাইকেলে করে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন।
এ ছাড়া ঘটনার রাতে তাদের সঙ্গে অন্য কেউ বা কোনো নারী ছিলেন কি না, সে বিষয়েও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ কল এবং বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাহসিফ ও দীপের মধ্যে ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে ১০ থেকে ১২ বার যোগাযোগ হয়েছিল।
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। পরিবারের সদস্যদের দাবি, দীপের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যেই তিনি বাসা থেকে বের হন।
এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাহসিফ ও দীপকে একসঙ্গে দেখা যায়। সেখানে তারা পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলানোর পর আলাদা দুটি মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যান।
পরিবারকে দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা দেখা দেওয়ায় তারা একটি ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। মেরামতের কাজ শেষে একসঙ্গে খাবার খেয়ে তারা আলাদা হয়ে যান। তবে পরবর্তী তদন্তে তাদের রাতের চলাফেরা এবং টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় যাওয়ার তথ্য সামনে আসে।
পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে সেটি উদ্ধার করেন। পরে হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে মরদেহটি তাহসিফের বলে শনাক্ত করা হয়।
২৯ অক্টোবর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে পারছেন না তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। দীপের দেওয়া নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার বক্তব্য নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
তাহসিফের বাবা জানিয়েছেন, তার ছেলে সাঁতার জানতেন। পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেও তিনি সাঁতারের কোর্স সম্পন্ন করেছিলেন। ফলে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে তার মৃত্যু হয়েছে—এমন বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ছেলের মৃত্যুর পেছনে হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের সময় সংগ্রহ করা রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, তাহসিফ কীভাবে নদীতে গেলেন, ঘটনার রাতে তার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল এবং অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
মন্তব্য করুন