

নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জেলার পাঁচটি উপজেলার চেয়ারম্যান পদে বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি কয়েকজন সংসদ সদস্যের ছেলে, স্বজন ও রাজনৈতিক সচিবদের নাম আলোচনায় উঠে এসেছে। যদিও এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেননি, তবে তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে ইতোমধ্যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।
আলোচনায় রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের রাজনৈতিক সচিব আবুল কাউসার আশা এবং নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের রাজনৈতিক সচিব খায়রুল ইসলাম সজীব। তাঁদের দুজনেরই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জন রয়েছে। পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের পরিবারের সদস্যদের সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়া নিয়েও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে, বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক মামলা, হামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতাকর্মীও এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রত্যাশা করছেন। তাঁদের মধ্যে দলীয় মনোনয়ন ও তৃণমূলের সমর্থন পেতে ইতোমধ্যে অনেকে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছেন।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি উপজেলা পরিষদ ঘিরে দলীয় নেতৃত্ব, সাংগঠনিক প্রভাব ও স্থানীয় জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। তবে শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত, তৃণমূলের সমর্থন এবং স্থানীয় ভোটারদের গ্রহণযোগ্যতা প্রার্থী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রূপগঞ্জে আলোচনায় গোলাম ফারুক খোকন
রূপগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক খোকন। তিনি এর আগে জেলা যুবদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তিনি নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান দীপুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদেও যুবদল এবং মহিলা দলের কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে।
আড়াইহাজারে সুমন ও পারভীন আখতারকে নিয়ে আলোচনা
আড়াইহাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত মাহমুদুর রহমান সুমন এবং কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক পারভীন আখতার।
তবে তাঁদের সঙ্গে বর্তমান সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও সম্পর্ক নিয়েও স্থানীয় বিএনপির মধ্যে আলোচনা রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় অবস্থান ও মনোনয়ন প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল বলে স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। এ ঘটনায় পারভীন আখতারকে দল থেকে বহিষ্কার এবং মাহমুদুর রহমান সুমনকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
বন্দরে আলোচনায় এমপিপুত্র আবুল কাউসার আশা
নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার মধ্যে আয়তনে ছোট বন্দর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ঘিরেও রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। অতীতে এ উপজেলায় বিএনপি নেতাদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের নজির রয়েছে। বিগত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতারাও বিভিন্ন সময়ে এ দায়িত্ব পালন করেছেন।
এবার উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের ছেলে ও রাজনৈতিক সচিব আবুল কাউসার আশা। তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে অনুসারীদের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
এর আগে এ উপজেলায় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সংসদ সদস্য আবুল কালামের ভাই আতাউর রহমান মুকুল। তিনি দুইবার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফলে এবারও সংসদ সদস্যের পরিবারের ঘনিষ্ঠদের ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সোনারগাঁয়ে খায়রুল ইসলাম সজীবকে নিয়ে গুঞ্জন
সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে ও রাজনৈতিক সচিব খায়রুল ইসলাম সজীব। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিয়ে আলোচনা চলছে।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আজহারুল ইসলাম মান্নান সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই রাজনৈতিক পরিচিতি ও স্থানীয় সাংগঠনিক যোগাযোগকে কেন্দ্র করে তাঁর ছেলে সজীবের সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সদর উপজেলায় নতুন মুখের প্রত্যাশা
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও এবার নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশা করছেন বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা। অতীতে বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস দীর্ঘ সময় সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার তাঁর বাইরে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনার বিষয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ফতুল্লা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী এবং জেলা যুবদলের সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনির নাম আলোচনায় এসেছে।
তবে রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরীকে ঘিরে বিতর্কও রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার এবং দলীয় বহিষ্কারের বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। এসব অভিযোগ ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি উপজেলায় বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। সংসদ সদস্যদের স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের সম্ভাব্য প্রার্থিতা যেমন আলোচনায় রয়েছে, তেমনি দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে নির্যাতিত ও তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় নেতারাও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন।
এ অবস্থায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, প্রার্থী বাছাইয়ে পারিবারিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার পরিবর্তে সাংগঠনিক অবদান, রাজনৈতিক ত্যাগ, জনসম্পৃক্ততা ও স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে নারায়ণগঞ্জের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কারা প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামবেন।
মন্তব্য করুন